সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:১৩ অপরাহ্ন

“মনটা খারাপ কেন? গল্পটি লিখেছেন — সফেদ বিহান

মনটা খারাপ কেন?
— সফেদ বিহান

দুপুরের শরীর থেকে রোদ ঝরে গেছে। দোকানে বসে আছে সজল। ছোট কাঁচামালের দোকান তার। অল্প দিনেই বেশ জমিয়ে তুলেছে তার ব্যবসা। পাশের দোকানির সঙ্গে গল্প করছে—কীভাবে এখানে এসেছে সে, সেই গল্প।

পড়াশোনা শেষ করে চাকরি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত এই ব্যবসাকেই বেছে নিয়েছে।

এমন সময় দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন এক মধ্যবয়সী নারী। নিয়মিত সজলের দোকান থেকেই সওদা করেন তিনি। নারীটিকে দেখে সজল ডাক দিল—

—ও আপা, মনটা খারাপ কেন?

কে জানত, এই একটি প্রশ্নই তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে! অথচ সজল তো তাকে বোন ভেবেই কথাটা বলেছিল।

নারীর পাশে থাকা লোকটি তেড়ে এসে বলল—

—তুই কি তার মন ভালো করে দিতে পারবি? আমার বউকে কেন বললি এমন কথা?

সজল যেন বোকা বনে গেল।

—ভাই, আমি বোন ভেবেই বলেছি। কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই।

কিন্তু কে শোনে কার কথা! লোকটি সজলের দিকে তেড়ে এল। পাশের দোকানির কথাতেও তার রাগ কমল না। চিৎকার করে বলতে লাগল—

—সজলকে এখানে ব্যবসা করতে দেব না।

লোকটি চলে গেলে পাশের দোকানি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

—ভাই, এই লোক নেশাখোর। কেন এমন কথা বলতে গেলেন? ওই নারীও তো বলতে পারতেন, সজল তাকে ভাইয়ের মতোই দেখে।

এসব শুনে সজলের মনটা ভারী হয়ে গেল।

বিকেলের দিকে ক্লাবের লোক এসে জানিয়ে গেল—

—সন্ধ্যায় ক্লাবে বিচার হবে।

এই এলাকায় সজলের আপন বলতে কেউ নেই। সারাদিন মুখে লেগে থাকা হাসিটা আজ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। বারবার মনে হচ্ছে, সন্ধ্যায় কী হবে?

রাতে ক্লাবঘরে বিচার বসল। এলাকার অনেক মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছে।

লোকটি অভিযোগ করল—

—আমার বউকে রাস্তার মধ্যে দাঁড় করিয়ে কীসব কথা বলেছে।

সজল সঙ্গে সঙ্গে বলল—

—মিথ্যা কথা। আমি শুধু জিজ্ঞেস করেছি, “আপা, মনটা খারাপ কেন?” আমি তাকে নিজের বোনের মতোই দেখি।

ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বলল—

—নারীটাকে জিজ্ঞেস করুন।

সজল আশাভরা চোখে নারীটির দিকে তাকিয়ে বলল—

—বোন, আপনি কিছু বলুন। আপনি তো জানেন, আমি কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে বলিনি।

নারীটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। একটি কথাও বলল না।

কেউ একজন বলল—

—মেয়েটা চুপ মানে নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে।

অনেক কথাবার্তার পর ক্লাবের লোকেরা সিদ্ধান্ত জানাল—

—সজলকে ওই নারীকে বিয়ে করতে হবে।

আকাশ থেকে পড়ল সজল।

ঠিক তখনই ক্লাবের এক ব্যক্তি তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কানে কানে বলল—

—পঞ্চাশ হাজার টাকা দেন, তাহলে বিষয়টা এখানেই শেষ করে দেব।

উপায়হীন সজল শুধু বলল—

—আগামীকাল টাকা দিয়ে দেব।

বিচার শেষ হতে হতে রাত দুইটা বেজে গেল।

দোকানে ফিরে সজল ভাবতে লাগল, এত টাকা সে কোথায় পাবে? মিথ্যা অভিযোগের এই ঝামেলায় তার মাথা আর কাজ করছে না।

ঠিক তখনই পাশের দোকানি এসে বলল—

—সজল, তোর এখান থেকে পালিয়ে যাওয়াই ভালো হবে।

—কেন?

—এরা টাকা না পেলে তোকে ছাড়বে না। কাল আবার নতুন ঝামেলা করবে।

এত বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার সামর্থ্য তার ছিল না। সেই রাতেই সজল পালিয়ে গেল।

তারপর কেটে গেছে অনেক বছর।

আজও সজল সেই রাতের স্মৃতি বয়ে বেড়ায়। একটি সাধারণ প্রশ্ন কীভাবে তার জীবন বদলে দিয়েছিল, সেই ভয় এখনো তাকে তাড়া করে।

তাই সজল আর কোনো দিন কাউকে জিজ্ঞেস করে না—

“আপনার কি মন খারাপ?”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *