ভোরের প্রথম ট্রেনটি স্টেশনে ঢুকতেই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল ছোট্ট প্ল্যাটফর্মটি। যাত্রীরা যে যার গন্তব্যে ছুটছে। সেই ব্যস্ত ভিড়ের মাঝেই কাঁধে বইভর্তি ব্যাগ ঝুলিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছেন মাঝবয়সী এক মানুষ। মুখজুড়ে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখে-মুখে লেগে আছে অদম্য এক স্বপ্নের দীপ্তি।
লোকটির নাম আব্দুল করিম। পেশায় একজন হকার। ট্রেন থামলেই তিনি যাত্রীদের কাছে নামাজ শিক্ষা, ইসলামিক গল্প, হামদ-নাত, দোয়ার বইসহ নানা ধর্মীয় বই বিক্রি করেন। আয় সামান্য, কিন্তু সততায় তিনি কখনো আপস করেন না। অতিরিক্ত একটি টাকাও তিনি অন্যায়ভাবে নিজের পকেটে তোলেন না।
এদিকে বাড়িতে স্ত্রী জোবেদা খাতুনও বসে নেই। সংসারের সব কাজ শেষ করে তিনি প্রতিবেশীদের কাপড় সেলাই করেন। সারাদিন সেলাই মেশিনের চাকার সঙ্গে যেন ঘুরে চলে তাঁর জীবন। কখনো চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, আঙুলে সূচ ফোটে, তবুও কাজ থামে না।
তাদের এই নিরন্তর সংগ্রামের একটাই কারণ—একমাত্র মেয়ে মিথিলা।মিথিলা ইংরেজি বিভাগের অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী। বাবা-মায়ের বিশ্বাস, একদিন মেয়ে উচ্চশিক্ষিত হবে, সম্মানজনক চাকরি করবে। তখন তাদের অভাব, অনটন আর দীর্ঘশ্বাসে ভরা জীবন একদিন নিশ্চয়ই বদলে যাবে।তাই নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা তারা কোনোদিন ভাবেননি।
ঈদ এলেও বাবা নতুন পাঞ্জাবি কেনেন না, মা পুরোনো শাড়িটাই যত্ন করে পরে নেন। অথচ মেয়ের জন্য নতুন পোশাক, ভালো মানের বই, প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে দিতে কখনো কার্পণ্য করেননি।
শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুদের কাছে যেন মেয়েকে ছোট হতে না হয়—এই ভেবেই অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে একটি ভালো স্মার্টফোনও কিনে দিয়েছিলেন।
এক সন্ধ্যায় জোবেদা খাতুন সেলাই করতে করতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— শোনো, আমাদের জন্য এত কষ্ট করো কেন?শরীরটা তো আর আগের মতো নেই।
আব্দুল করিম মৃদু হেসে বললেন,
— কষ্ট করছি নিজের জন্য নাকি? সবই তো মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য। আজ আমরা কষ্ট করব, কাল ও সুখে থাকলে এই কষ্টের মূল্য পাওয়া হয়ে যাবে।স্ত্রীর চোখ ভিজে উঠল।
— আল্লাহ যেন আমাদের মেয়েটাকে মানুষের মতো মানুষ করেন।
আব্দুল করিম দুই হাত তুলে নিঃশব্দে বললেন,
— আমিন।
সময় কখনো মানুষের জীবন বদলে দেয়, আবার কখনো বদলে দেয় মানুষের মন।
একসময় যে মিথিলা বাবা-মায়ের সামান্য কষ্টেও কেঁদে ফেলত, সেই মেয়েটিই ধীরে ধীরে যেন অন্য এক মানুষ হয়ে উঠতে লাগল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর নতুন পরিবেশ, আধুনিক জীবনযাপন আর উচ্চবিত্ত সহপাঠীদের সঙ্গে মেলামেশা তার চিন্তা-চেতনায় অদ্ভুত এক পরিবর্তন এনে দিল।
এখন আর সে আগের মতো নয়।মা কোনো কাজে ডাকলে বিরক্ত হয়, বাবা একটু দেরিতে টাকা এনে দিলে রাগে মুখ ভার করে থাকে। সামান্য বিষয়েও চিৎকার-চেঁচামেচি, কখনো ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর, কখনো না খেয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়া—এসব যেন তার নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জোবেদা খাতুন অনেকবার মেয়েকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই উত্তর এসেছে তীক্ষ্ণ ভাষায়।
— তোমরা বুঝবে না। এই এই যুগে সম্মান নিয়ে চলতে কত কিছু লাগে!
মা কষ্ট পেয়েও চুপ করে যান।আব্দুল করিমও মেয়ের ওপর কখনো কঠোর হন না। বরং মেয়ের রাগের আড়ালে নিজের অক্ষমতাকেই দোষ দেন।রাতে স্ত্রীকে তিনি শান্ত গলায় বলেন,
— মেয়েটা হয়তো আমাদের অভাবের জন্যই এমন করছে। আমরা যদি একটু সচ্ছল হতাম, হয়তো ওর মনটা এমন হতো না।
জোবেদা খাতুন চোখের পানি লুকিয়ে বলেন,
— তবু ও তো আমাদের মেয়ে। একদিন না একদিন নিশ্চয়ই বুঝবে।
আব্দুল করিম আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তিনি জানেন না, মানুষ যখন নিজের পরিচয় লুকাতে শেখে, তখন তার বিবেকও ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে মিথিলা ছিল অত্যন্ত সুন্দরী ও মেধাবী ছাত্রী। সেই সুবাদে অনেকেই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইত। কিন্তু তাদের সবার ভিড়ে একজন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
রাজীব চৌধুরী।বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্র।ধনী পরিবারের সন্তান হলেও তার মধ্যে বিন্দুমাত্র অহংকার ছিল না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, নিয়মিত রোজা রাখত, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে ভালোবাসত। রাস্তার টোকাই শিশুদের নতুন জামা, খাবার কিংবা বই কিনে দেওয়া ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মচারী—সবার কাছেই সে ছিল ভদ্র, বিনয়ী ও সৎ চরিত্রের যুবক।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে আকস্মিকভাবে মিথিলার সঙ্গে তার পরিচয় হয়।সাধারণ একটি পরিচয়, তারপর বন্ধুত্ব।বন্ধুত্ব থেকে ভালো লাগা।
আর সেই ভালো লাগাই একসময় রূপ নেয় গভীর ভালোবাসায়।
দুজনের অবসর সময় কাটতে থাকে একসঙ্গে। ক্লাসের ফাঁকে ক্যান্টিনে বসে গল্প, ক্যাম্পাসের নিরিবিলি পথে হাঁটা, মাঝেমধ্যে দীর্ঘ ফোনালাপ—ধীরে ধীরে তারা একে অপরের জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে।
রাজীব মিথিলাকে ভালোবাসত তার সরলতা, মেধা আর ব্যক্তিত্বের জন্য।অথচ সে জানত না, যাকে সে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করছে, সেই মানুষটিই তার জীবন থেকে সবচেয়ে বড় সত্যটি লুকিয়ে রেখেছে।
ভালোবাসার সম্পর্ক যত গভীর হতে লাগল, মিথিলার বুকের ভেতর ততই বাড়তে লাগল এক অদৃশ্য আতঙ্ক। রাজীবকে সে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে, কিন্তু নিজের পরিচয় প্রকাশ করার সাহস তার নেই।
সে জানে, সত্য একদিন না একদিন প্রকাশ হবেই। তবু সেই দিনটিকে যতটা সম্ভব দূরে ঠেলে দিতে চায়।
এক বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে বসে দুজনে গল্প করছিল।হঠাৎ রাজীব মৃদু হেসে বলল,
— মিথিলা, আমাদের সম্পর্কের অনেক দিন হয়ে গেল। অথচ আজও তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো না। তোমার পরিবার সম্পর্কে তো কিছুই জানি না।
মিথিলার বুকটা ধক করে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য সে নির্বাক হয়ে রইল।রাজীব আবার বলল,
— কী হলো? চুপ করে আছ কেন?
নিজেকে সামলে নিয়ে মিথিলা ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল,
— আসলে বলার মতো তেমন কিছু নেই।
— তবুও শুনতে চাই।
মিথিলা গভীর শ্বাস নিয়ে এমন এক গল্প বলতে শুরু করল, যার প্রতিটি শব্দই ছিল মিথ্যার ওপর দাঁড়ানো।
— আমার বাবা বড় ব্যবসায়ী। আমাদের নিজস্ব বাড়ি, গাড়ি, জমিজমা—কোনো কিছুর অভাব নেই। আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ভবিষ্যতে সব সম্পত্তির মালিক হব।
রাজীব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
— জানো মিথিলা, তোমার কথাগুলো শুনে আমার ভালো লাগার কথা। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এগুলোর কোনোটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।মিথিলা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
— মানে?
— আমি তোমার ধন-সম্পদ দেখে তোমাকে ভালোবাসিনি। ভালোবেসেছি তোমার ভেতরের মানুষটাকে। একজন মানুষের চরিত্র, সততা আর ব্যক্তিত্বই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয়।
রাজীবের কথাগুলো শুনে মিথিলার বুকের ভেতর হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।সে মনে মনে বলল,
–“যদি সত্যিই মানুষটাকেই ভালোবেসে থাকো, তবে আমি কেন সত্য বলতে পারছি না?”
কিন্তু পরক্ষণেই তার অহংকার সেই প্রশ্নটাকে চাপা দিয়ে দিল।পরিবেশটা হালকা করতে মিথিলা মুচকি হেসে বলল,
— শুধু পছন্দ করো, নাকি ভালোবাসোও?
রাজীবও হেসে উত্তর দিল,
— পছন্দ করি বললে কম বলা হবে। আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর যদি আল্লাহ চান, পড়াশোনা শেষ করে তোমাকেই বিয়ে করব।
মিথিলার চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা দিল। কিন্তু সেই আনন্দের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল গভীর ভয়।সে ধীরে ধীরে বলল,
— যদি আমরা তার আগেই বিয়ে করে ফেলি?
রাজীব বিস্মিত হয়ে তাকাল।
— এখনই বিয়ে?
— হ্যাঁ। পরে তো করবই। তাহলে এখন করলে সমস্যা কোথায়?
রাজীব দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— সমস্যা আছে, মিথিলা। বিয়ে শুধু দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়, দুটি পরিবারেরও বন্ধন। বাবা-মায়ের অমতে, গোপনে বিয়ে করা আমি কখনোই সমর্থন করি না। পড়াশোনা শেষ হবে, তারপর দুই পরিবারের সম্মতিতে, সবার দোয়া নিয়ে তোমাকে ঘরে তুলব।
মিথিলা ঠোঁট কামড়ে বলল,
— যদি তোমার পরিবার আমাকে মেনে না নেয়?
রাজীব বিনা দ্বিধায় উত্তর দিল,
— আমার বাবা-মা মানুষকে তার চরিত্র দিয়ে বিচার করেন, অর্থ দিয়ে নয়। আমি যাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করব, তারা তাকে সম্মানই করবেন।
‘চরিত্র’ শব্দটি শুনে মিথিলার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল।সে বুঝতে পারল, আজ নয় তো কাল—তার বলা মিথ্যাগুলোই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়াবে।তবুও সে সত্য স্বীকার করল না।বরং নতুন আরেকটি মিথ্যার আশ্রয় নিল।
— রাজীব, মা আমার বিয়ের কথা, এক আত্মীয়ের ছেলের সঙ্গে প্রায় ঠিক করে ফেলেছেন। ছেলেটা মেডিকেলে পড়ে। তাই আমি খুব ভয় পাচ্ছি।রাজীব বিস্মিত হয়ে বলল,
— তাহলে কালই তোমাদের বাসায় যাব।আন্টি-আঙ্কেলের সঙ্গে কথা বলব।
মিথিলা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো।
— না! না, এখন নয়।
— কেন?
— সময় হলে আমি নিজেই সব বলব। এখন গেলে উল্টো সমস্যা হবে।
রাজীব কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
— ঠিক আছে। আমি তোমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করলাম। তবে একটা কথা মনে রেখো—ভালোবাসার ভিত্তি কখনো মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
মিথিলা মাথা নিচু করে রইল।
রাজীব চৌধুরীর পরিবার শহরের অন্যতম সম্মানিত পরিবার। অর্থ-বিত্তের কোনো অভাব না থাকলেও অহংকার তাদের স্পর্শ করতে পারেনি।রাজীবের বাবা ইমরান চৌধুরী ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। ব্যবসার প্রতিটি ধাপে তিনি ইসলামের নীতিমালা মেনে চলার চেষ্টা করতেন। বছরের শেষে হিসাব করে নিয়মিত যাকাত আদায় করতেন। ঈদুল আজহার আগে অসহায় মানুষের হাতে যাকাতের অর্থ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়া ছিল তাঁর বহু বছরের অভ্যাস। এলাকার মানুষ তাঁকে শুধু ধনী ব্যবসায়ী হিসেবেই নয়, একজন সৎ ও দয়ালু মানুষ হিসেবেও শ্রদ্ধা করত।
ছেলেও বাবার পথেই হাঁটছিল।যাকাতের বাইরে নিজের উপার্জনের টাকা দিয়েও রাজীব অসহায় শিশুদের জামাকাপড়, বই-খাতা ও খাবার কিনে দিত। রাস্তার টোকাই শিশুরা দূর থেকে তাকে দেখলেই ছুটে আসত। রাজীবও কখনো তাদের খালি হাতে ফিরিয়ে দিত না।
তাই আশপাশের সবাই তাকে ভালোবেসে ডাকত—’গরিবের বন্ধু’।
কয়েকদিন পর ছিল রাজীবের জন্মদিন।ইমরান চৌধুরী সিদ্ধান্ত নিলেন, এবার ছেলের জন্মদিনটি একটু ভিন্নভাবে উদ্যাপন করবেন। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের পাশাপাশি এলাকার কিছু দরিদ্র মানুষকেও দাওয়াত করা হলো।খবরটা শুনে মিথিলাও বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।সে মনে মনে ভাবল,
–“রাজীবের পরিবারের কাছে আমার সম্মান বজায় রাখতে হলে এমন একটি উপহার দিতে হবে, যা দেখলে সবাই মুগ্ধ হয়ে যাবে।”
কিন্তু সেই দামী উপহার কেনার সামর্থ্য কি তার পরিবারের ছিল?
সন্ধ্যায় বাবা স্টেশন থেকে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরতেই মিথিলা দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— বাবা, আমার দুই হাজার টাকা লাগবে।
আব্দুল করিম অবাক হয়ে তাকালেন।
— দুই হাজার টাকা? এত টাকা কী করবে মা?
— আমার এক বন্ধুর জন্মদিন। ও খুব বড়লোকের ছেলে। ভালো একটা উপহার না নিয়ে গেলে আমার সম্মান থাকবে না।
আব্দুল করিম কিছুক্ষণ নীরবে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।তারপর শান্ত গলায় বললেন,
— মা, আমরা তো গরিব মানুষ। সামর্থ্যের মধ্যে কিছু দিলেই তো হয়। মানুষ উপহারের দাম দেখে নয়,ভালোবাসা দেখে।
মিথিলা বিরক্ত হয়ে উঠল।
— এসব কথা তুমি বুঝবে না। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। সবাই যদি দামী উপহার দেয়, আর আমি সস্তা কিছু নিয়ে যাই, তাহলে আমাকে ছোট হতে হবে।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— নিজের পরিচয় লুকিয়ে সম্মান পাওয়া যায় না, মা। সত্যের ওপর দাঁড়ানো সম্মানই সবচেয়ে বড় সম্মান।
কথাগুলো মিথিলার কানে পৌঁছালেও হৃদয়ে পৌঁছাল না।
সে রাগে ঘরের একটি ফুলদানি মেঝেতে ছুড়ে মারল।
ঝনঝন শব্দে সেটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
জোবেদা খাতুন ভয়ে ছুটে এলেন।
— কী করছিস মা?
মিথিলা উত্তেজিত কণ্ঠে বলল,
— আমার দুই হাজার টাকা চাই। এর কমে কিছু হবে না।
আব্দুল করিম স্ত্রীর দিকে একবার তাকিয়ে মৃদু স্বরে বললেন,
— আচ্ছা মা, আর রাগ করিস না। কালই টাকা দিয়ে দেব।
মেয়ের মুখে তখন হাসি ফুটল।সে নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে চলে গেল।কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে রইল একজন বাবার দীর্ঘশ্বাস।রাতে খাবার শেষ করে জোবেদা খাতুন ধীরে ধীরে বললেন,
— এত টাকা কোথায় পাবে?
আব্দুল করিম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু হেসে বললেন,
— আল্লাহ বড়। কোনো না কোনো ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
— কিন্তু সংসারের বাজার?
— বাজার দুদিন পরে হলেও চলবে। মেয়ের মনটা যেন না ভাঙে।
জোবেদা খাতুন আর কোনো কথা বলতে পারলেন না।
তিনি শুধু স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এই মানুষটা নিজের জন্য কখনো কিছু চাননি।
শুধু একমাত্র মেয়ের মুখে হাসি দেখার জন্য বারবার নিজের ইচ্ছা, নিজের প্রয়োজন, নিজের সুখ—সবকিছু নীরবে কোরবানি দিয়ে গেছেন।
নির্ধারিত দিনটি অবশেষে চলে এল।রাজীব চৌধুরীর জন্মদিন উপলক্ষে সকাল থেকেই তাদের বাড়িতে ছিল উৎসবের আমেজ। রঙিন আলোকসজ্জা, ফুলের সাজ, অতিথিদের ব্যস্ত আনাগোনা—সব মিলিয়ে যেন এক আনন্দমুখর পরিবেশ।কিন্তু আয়োজনের সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল অন্য কিছু।
ইমরান চৌধুরীর নির্দেশে অতিথিদের জন্য যেমন সুস্বাদু খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তেমনি এলাকার অসহায় মানুষদের জন্যও আলাদা খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই প্রকৃত আনন্দ।বিকেলের দিকে একে একে অতিথিরা আসতে শুরু করলেন।রাজীব ও তার বাবা সাদরে সবাইকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছিলেন।ঠিক তখনই একটি সিএনজি এসে থামল বাড়ির সামনে।
নেমে এল মিথিলা ও তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী সিনথিয়া।
দুজনই অত্যন্ত পরিপাটি পোশাকে সেজেছে। মিথিলাকে দেখে বোঝার উপায় নেই, সে একজন সামান্য হকারের মেয়ে। নিজের পরিচয়কে আড়াল করতে সে যেন সাজের আড়ম্বরকেই ঢাল বানিয়েছে।
রাজীব দ্রুত এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলল,
— স্বাগতম, মিথিলা। আমি ভেবেছিলাম হয়তো তুমি আসবে না।মিথিলাও হাসল।
— তোমার জন্মদিনে না এসে কী থাকতে পারি?
তার হাতে ছিল দামী মোড়কে মোড়ানো একটি উপহার।
সেটি রাজীবের হাতে দিয়ে বলল,
— হ্যাপি বার্থডে। আল্লাহ তোমার জীবন সুন্দর ও বরকতময় করুন।
রাজীব কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উপহারটি গ্রহণ করল।
— ধন্যবাদ। তোমার আসাটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার।
কথাটি শুনে মিথিলার বুকটা কেঁপে উঠল।যে মানুষটি ভালোবাসার মূল্য বোঝে, তার কাছেই সে প্রতিদিন মিথ্যার পাহাড় গড়ে তুলছে।কিছুক্ষণ পর রাজীব তাকে নিজের মায়ের কাছে নিয়ে গেল।
— মা, এ হলো আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, মিথিলা।
মিথিলা সম্মানের সঙ্গে সালাম করতেই রাজীবের মা স্নেহভরে তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
— বেঁচে থাকো মা। আল্লাহ তোমাকে নেক হায়াত দান করুন।
অল্প সময়ের মধ্যেই দুজনের মধ্যে আন্তরিক আলাপ জমে উঠল।কথা বলতে বলতে তিনি জানতে চাইলেন,
— তোমার বাবা কী করেন, মা?
প্রশ্নটি শুনে মিথিলার বুক ধড়ফড় করে উঠল।তবুও মুখে হাসি ধরে রেখে বলল,
— বাবা ব্যবসা করেন। শহরে আমাদের নিজস্ব বাড়ি আছে। আমি বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে।আরও কয়েকটি প্রশ্নেরও সে একইভাবে সাজানো উত্তর দিল।
মিথ্যার পর মিথ্যা।একবারও তার বিবেক তাকে থামাতে পারল না।
রাজীবের মা সরল বিশ্বাসে সব কথা মেনে নিলেন।
মেয়েটির ভদ্র ব্যবহার, শিক্ষিত কথাবার্তা আর মার্জিত আচরণ দেখে তিনি মনে মনে ভাবলেন,
–“এমন একটি মেয়ে যদি আমার রাজীবের জীবনসঙ্গী হয়, তাহলে আমার আর কোনো চাওয়া থাকবে না।”
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা বিদায় নিলে তিনি ছেলের পাশে বসে মৃদু হেসে বললেন,
— রাজীব, মেয়েটিকে আমার খুব ভালো লেগেছে।
রাজীব লজ্জায় মুচকি হাসল।
— সত্যি, মা?
— হ্যাঁ। যদি তোমারও পছন্দ থাকে, তাহলে একদিন ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চাই।
রাজীব আনন্দে যেন আত্মহারা হয়ে গেল।সে জানত, তার বাবা-মা মানুষকে সম্মান করতে জানেন। তাই মিথিলাকে তারা অপছন্দ করবেন—এমন ভাবনা তার মনেই আসেনি।সেদিন রাতেই সে ফোন করল মিথিলাকে।ফোন ধরতেই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
— জানো, আজ মা তোমাকে খুব পছন্দ করেছেন। তিনি খুব শিগগিরই তোমাদের বাসায় গিয়ে আন্টি-আঙ্কেলের সঙ্গে কথা বলতে চান।
কথাটি শুনে মিথিলার সমস্ত আনন্দ মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।মনে হলো, বুকের ভেতর কেউ যেন বরফের পাথর বসিয়ে দিয়েছে।কাঁপা গলায় বলল,
— না… এখন নয়।
— কেন?
— আমি… আমি এখনো বাবা মাকে -মাকে আমাদের সম্পর্কের কথা বলিনি।
রাজীব শান্ত স্বরে বলল,
— তাহলে বলো। সত্য কথা বলতে ভয় কিসের?
মিথিলা কোনো উত্তর দিতে পারল না।কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে আবার বলল,
— প্লিজ, কিছুদিন অপেক্ষা করো।
রাজীব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— ঠিক আছে। তবে মনে রেখো, সত্যকে যত দেরিতে বলা হয়, তার মূল্য তত বেশি দিতে হয়।
ফোন কেটে গেল।মিথিলা বিছানায় বসে রইল।
আজ প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
একটি মিথ্যা ঢাকতে গিয়ে সে প্রতিদিন আরও বড় মিথ্যার জন্ম দিচ্ছে।
সারারাত ঘুম এল না মিথিলার।বারবার রাজীবের শেষ কথাগুলো কানে ভেসে উঠতে লাগল—
“সত্যকে যত দেরিতে বলা হয়, তার মূল্য তত বেশি দিতে হয়।”
কথাগুলো যেন তার বিবেকের দরজায় একের পর এক আঘাত হানছিল। তবুও অহংকার তাকে সত্য স্বীকার করার সাহস দিল না।পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই মোবাইল ফোনে রাজীবের একটি বার্তা দেখতে পেল।
“গুড মর্নিং, মিথিলা। আল্লাহ যেন তোমার দিনটি সুন্দর করেন।”
বার্তাটি পড়ে মিথিলার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটলেও মনের অস্থিরতা একটুও কমল না।
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে মায়ের ডাক ভেসে এল—
— মিথিলা… মা… নাস্তা করে যা।
প্রথম ডাকের কোনো উত্তর এল না।জোবেদা খাতুন আবার ডাকলেন,
— মা, তোর পছন্দের পরোটা আর ডিম ভেজে রেখেছি। ঠান্ডা হয়ে যাবে।
বিরক্ত মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে এল মিথিলা।টেবিলের দিকে একবার তাকিয়েই বলল,
— এসব আমি খাব না।
— কেন মা? সকালে কিছু না খেয়ে বের হওয়া ভালো নয়।
— তোমাদের এই সাধারণ খাবার খেতে আমার ভালো লাগে না।
কথাগুলো বলেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল সে।জোবেদা খাতুন কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নীরবে চোখের কোণ মুছে আবার রান্নাঘরে ফিরে গেলেন।
ঠিক সেই সময় স্টেশন থেকে ফিরলেন আব্দুল করিম।
হাতে বইভর্তি ব্যাগ, মুখে ক্লান্তির ছাপ। দরজায় ঢুকেই তিনি বুঝতে পারলেন বাড়ির পরিবেশ অস্বাভাবিক নীরব।
স্ত্রীর কাছে সব শুনে তাঁর মুখটা মলিন হয়ে গেল।
— না খেয়েই চলে গেছে?
— হ্যাঁ। অনেক বুঝিয়েছি, শোনেনি।
আব্দুল করিম আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না।ব্যাগটা রেখে দ্রুত রওনা দিলেন স্টেশনের দিকে। যদি মেয়েকে কোথাও দেখতে পান, অন্তত কিছু টাকা দিয়ে বলতে পারবেন—ভালো কিছু খেয়ে নিস।স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড—সবখানে খুঁজলেন।কিন্তু কোথাও মেয়েকে পেলেন না।
ক্লান্ত শরীরে একটি বেঞ্চে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
নিজের পেটের ক্ষুধার কথা তিনি ভুলে গেছেন।
মনের ভেতর শুধু একটাই চিন্তা—
“মেয়েটা না খেয়ে আছে।”
তিনি আর বাড়ি ফিরে নাস্তা করলেন না।আবার বইভর্তি ব্যাগ কাঁধে তুলে নিলেন।নিজের ক্ষুধার চেয়ে মেয়ের প্রয়োজনই তাঁর কাছে বড়।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শেষ হওয়ার পর রাজীব মিথিলার কাছে এসে দাঁড়াল।মুখে পরিচিত সেই আন্তরিক হাসি।
— চলো, আজ ক্যান্টিনে বসি।
দুজন পাশাপাশি বসতেই ওয়েটার নাস্তা এনে দিল।
মিথিলা সকাল থেকে কিছু না খাওয়ায় খুব ক্ষুধার্ত ছিল।খেতে খেতে রাজীব হঠাৎ বলল,
— মিথিলা, একটা কথা বলব?
— বলো।
— আজ আর তোমার কোনো অজুহাত শুনব না। ক্লাস শেষে তোমাদের বাসায় যাব। আন্টি-আঙ্কেলের সঙ্গে পরিচয় করে আসব।
মিথিলার কন্ঠ থেমে গেল।মুহূর্তেই মুখের রং ফ্যাকাশে হয়ে উঠল।নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
— আজ যেও না, প্লিজ।
— কেন?
— মা-বাবা গ্রামের বাড়িতে গেছেন। নানু অসুস্থ।
রাজীব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।তার মনে হলো, মিথিলা যেন প্রতিবারই নতুন কোনো কারণ দেখায়।তবুও সে সন্দেহ প্রকাশ করল না।শান্ত গলায় বলল,
— ঠিক আছে। আজ নয়, অন্যদিন যাব।
কথাটা শুনে মিথিলা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।কিন্তু সে বুঝতে পারল না—
মিথ্যার পথ যত দীর্ঘ হয়, সত্য তত দ্রুত তার পিছু নেয়।
বিকেলের ক্লাস শেষে দুজনে লোকাল বাসে উঠল।
জানালার পাশে পাশাপাশি বসে গল্প করতে করতে বাসটি ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ত সড়ক পেরিয়ে এগিয়ে চলল।
রাজীব ভবিষ্যতের নানা স্বপ্নের কথা বলছে। পরীক্ষা শেষ হলে কীভাবে দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হবে, সেই স্বপ্নে বিভোর সে।মিথিলা চুপচাপ শুনছে।তার ঠোঁটে হাসি থাকলেও বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কাঁপছে।হঠাৎ তীব্র যানজটে বাসটি থেমে গেল।
কিছুক্ষণ পর দরজা দিয়ে উঠে এলেন মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি। রোদে পুড়ে শ্যামলা হয়ে যাওয়া মুখ, পরনে ধুয়ে ধুয়ে রঙ হারানো একটি পাঞ্জাবি, কাঁধে পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।ব্যাগভর্তি ইসলামিক বই।
লোকটি ধীর কণ্ঠে বলতে লাগলেন,
— নামাজ শিক্ষা, দোয়ার বই, হামদ-নাত, শিশুদের ইসলামিক গল্প… দেখে যেতে পারেন।
তিনি এক সিট থেকে আরেক সিটে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
বেশিরভাগ যাত্রীই মুখ ফিরিয়ে নিল।কেউ বই হাতে নিয়েও আবার ফিরিয়ে দিল।তবুও লোকটির কণ্ঠে বিরক্তি নেই। সততার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
একসময় তিনি রাজীবের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
রাজীব একটি বই হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখল।
তারপর বলল,
— আঙ্কেল, এই নামাজ শিক্ষার বইগুলো আমাকে দিন।
— কয়টা বাবা?
— এক ডজন দিন। কয়েকজন ছোট ছেলেকে উপহার দেব।
লোকটির চোখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।তিনি বইগুলো এগিয়ে দিলেন।
রাজীব পকেট থেকে পাঁচশ টাকার একটি নোট বের করে দিল।বইয়ের দাম কেটে বাকি টাকা ফেরত দিতে গিয়ে লোকটি বললেন,
— এই নিন বাবা, আপনার বাকি টাকা।
রাজীব মৃদু হেসে বলল,
— না আঙ্কেল, টাকাগুলো আপনি রেখে দিন।
লোকটি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বললেন,
— না বাবা, এটা আমি নিতে পারব না।
— কেন?
— আল্লাহ আমাকে সুস্থ শরীর দিয়েছেন। আমি পরিশ্রম করে উপার্জন করতে পারি। কাজ করার শক্তি থাকতে দান গ্রহণ করা ঠিক নয়। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) আমাদের এ শিক্ষাই দিয়েছেন।
রাজীব শ্রদ্ধাভরে লোকটির দিকে তাকিয়ে রইল।তার চোখে ফুটে উঠল গভীর সম্মান।
— আমাকে ক্ষমা করবেন, আঙ্কেল। আমি আপনাকে ছোট করতে চাইনি।লোকটি স্নেহভরে বললেন,
— তুমি কোনো ভুল করোনি বাবা। মানুষের উপকার করার ইচ্ছাটাই বড়। আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
মিথিলা এতক্ষণ মাথা নিচু করে বসে ছিল।তার বুকের ভেতর যেন ঢাক বাজছে।এই মানুষটি…,এই মানুষটিই তার বাবা।সে চাইছিল, বাবা যেন তাকে না দেখেন।
কিন্তু বাবার চোখে সন্তানের মুখ লুকিয়ে থাকে না।
আব্দুল করিম মেয়ের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন।
মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখে অফুরন্ত স্নেহ।তিনি পকেট থেকে একটি একশ টাকার নোট বের করে মেয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
— মা, এটা রাখ।
মিথিলা কোনো উত্তর দিল না।বাবা আবার মমতা ভরা কণ্ঠে বললেন,
— তোর মা বলল, সকালে না খেয়ে বেরিয়ে গেছিস। তোকে খুঁজতে স্টেশনে গিয়েছিলাম, পাইনি। তোর জন্য আমিও আজ কিছু খাইনি। এই টাকাটা দিয়ে ভালো কিছু খেয়ে নিস, মা।
মিথিলার মাথা আরও নিচু হয়ে গেল।চারপাশের যাত্রীরা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে।লজ্জা, অহংকার আর ভয়ের অদ্ভুত এক লড়াই শুরু হলো তার ভেতরে।সে না টাকা নিল, না কোনো উত্তর দিল।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আব্দুল করিম নোটটি আলতো করে মেয়ের ব্যাগের ওপর রেখে বললেন,
— ঠিকমতো খেয়ে নিস, মা।
তারপর ধীর পায়ে বাস থেকে নেমে গেলেন।বাস আবার চলতে শুরু করল।রাজীব অনেকক্ষণ নীরবে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।তারপর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
— মিথিলা… ভদ্রলোক কে?
এক মুহূর্তের জন্য মিথিলার মনে হলো—সব সত্য বলে দেয়।কিন্তু অহংকার আবারও তাকে হারিয়ে দিল।সে ঠোঁট শুকিয়ে আসা কণ্ঠে বলল,
— উনি… আমাদের পাশের বাসায় থাকেন।
রাজীব ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।তার চোখের শান্ত দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।সে স্পষ্ট বুঝে গেছে—
মিথিলা শুধু মিথ্যা বলেনি।আজ সে নিজের জন্মদাতা বাবাকেই অস্বীকার করেছে।
আর এই মুহূর্তেই তাদের সম্পর্কের ভিত নীরবে ভেঙে পড়তে শুরু করল…।
বাসটি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে চলেছে।কিন্তু রাজীবের ভেতরের পৃথিবী যেন থেমে গেছে।
সে কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল। তারপর গভীর দৃষ্টিতে মিথিলার দিকে তাকাল।তার কণ্ঠে আর আগের সেই কোমলতা নেই। বরং ছিল একরাশ কষ্ট আর হতাশা।
— মিথিলা, তুমি কি জানো, একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় কী?
মিথিলা কোনো উত্তর দিল না।রাজীব আবার বলল,
— মানুষের পরিচয় তার অর্থ-সম্পদে নয়, তার চরিত্রে। অথচ তুমি আজ তোমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটিকেই অস্বীকার করলে।মিথিলা কাঁপা গলায় বলল,
— তুমি… তুমি কী বলতে চাইছ?
রাজীব শান্তভাবে উত্তর দিল,
— ভদ্রলোক তোমার বাবা। তাই না?
মিথিলা এবারও নীরব।তার নীরবতাই সব প্রশ্নের উত্তর হয়ে গেল।রাজীব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— আমি যখন তাঁকে অতিরিক্ত টাকা দিতে চেয়েছিলাম, তিনি তা ফিরিয়ে দিলেন। কারণ তিনি পরিশ্রমের বিনিময়ে উপার্জন করতে চান। এমন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ খুব কম দেখা যায়।একটু থেমে আবার বলল,
— আর সেই মানুষটিই যখন মেয়ের জন্য না খেয়ে ঘুরে বেড়ান, নিজের কষ্ট ভুলে সন্তানের হাতে শেষ সম্বলটুকু তুলে দেন—তখন বুঝতে পারি, তিনি শুধু একজন বাবা নন, একজন আদর্শ বাবা।
মিথিলার চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে লাগল।
রাজীবের প্রতিটি শব্দ যেন তার হৃদয়ে তীক্ষ্ণ তীরের মতো বিঁধছিল।রাজীব বলল,
— জানো মিথিলা, আমি গরিবকে কখনো ছোট করে দেখিনি। কারণ আমার বাবা শিখিয়েছেন, মানুষকে তার পোশাক দিয়ে নয়, তার সততা দিয়ে মূল্যায়ন করতে হয়।কিন্তু তুমি…
তুমি তোমার বাবার পেশাকে লজ্জা মনে করলে।
যে বাবা নিজের ছেঁড়া জামা পরে তোমাকে নতুন পোশাক কিনে দিয়েছেন…,।
যে বাবা নিজের ক্ষুধা ভুলে তোমার জন্য না খেয়ে থেকেছেন…।
যে বাবা দিনের পর দিন রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বই বিক্রি করেছেন, শুধু তোমাকে মানুষ করার জন্য…,
আজ তুমি সেই বাবাকেই অস্বীকার করলে!
রাজীবের কণ্ঠ ভারী হয়ে এল।
— আমি ভেবেছিলাম, তুমি সত্যবাদী, সাহসী আর আত্মমর্যাদাসম্পন্ন একজন মানুষ। কিন্তু আজ বুঝলাম, তুমি নিজের পরিচয় নিয়েই লজ্জিত।
যে মেয়ে নিজের জন্মদাতা বাবাকে মানুষজনের সামনে অস্বীকার করতে পারে, সে প্রয়োজনে একদিন স্বামীকেও অস্বীকার করতে দ্বিধা করবে না।
আমি এমন একজন মানুষকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করতে পারব না।আমাকে ক্ষমা করে দিও।আজ থেকেই আমাদের পথ আলাদা।আল্লাহ তোমাকে হেদায়েত করুন।খোদা হাফেজ।
কথাগুলো বলেই পরের স্টপেজে বাস থেকে নেমে গেল রাজীব।মিথিলা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।সে ডাকতে চাইল—
–“রাজীব…!”
কিন্তু শব্দগুলো যেন গলায় আটকে গেল।বাসের জানালা দিয়ে সে দেখল, রাজীব ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে।একসময় মানুষের ভিড়ে মিলিয়ে গেল তার অবয়ব।মিথিলা দুই হাতে মুখ ঢেকে অঝোরে কাঁদতে লাগল।আজ সে বুঝতে পারল—গরিব হওয়া লজ্জার নয়।লজ্জার হলো নিজের শেকড়কে অস্বীকার করা।
যে মানুষটির পরিচয় দিতে সে লজ্জা পেয়েছিল, সেই মানুষটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে দরজার সামনে দাঁড়িয়েই সে থমকে গেল।আব্দুল করিম নামাজ শেষে মোনাজাতে দুই হাত তুলে বলছেন—
— হে আল্লাহ, আমার মেয়েটাকে মানুষের মতো মানুষ করে দিও। ওর জীবনটা সুখে ভরে দিও। আমার জন্য কিছু চাই না। সব সুখ আমার মেয়েটার কপালে লিখে দিও।
বাবার সেই আকুল প্রার্থনা শুনে মিথিলার বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।সে ছুটে গিয়ে বাবার পায়ে লুটিয়ে পড়ল।কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— বাবা… আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি তোমাকে চিনতে পারিনি। তোমার ভালোবাসার মর্যাদা দিতে পারিনি।
আব্দুল করিম বিস্ময়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।
পরক্ষণেই স্নেহভরে তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।
চোখের কোণে জল নিয়ে বললেন,
— বাবা-মা সন্তানের ওপর রাগ করে থাকতে পারে না, মা। মানুষ ভুল করে, কিন্তু সেই ভুল বুঝে ফিরে আসাটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।মিথিলা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
তার চোখের জল যেন অহংকারের সমস্ত কালিমা ধুয়ে নিয়ে গেল।সেদিন সে বুঝেছিল—
একজন বাবার প্রকৃত পরিচয় তাঁর পেশায় নয়, তাঁর ত্যাগে।তাঁর পোশাকে নয়, তাঁর আদর্শে।
আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ-সম্পদ নয়—
একজন “আদর্শ বাবার” নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
— সমাপ্ত –