সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:০২ অপরাহ্ন

সুরের জাদুকর চন্দন সিনহার শুভ জন্মদিন: বাংলা মেলোডি গানের এক সোনালী অধ্যায়

বিনোদন প্রতিবেদক | ঢাকা

বাংলা চলচ্চিত্র ও আধুনিক সংগীতের অন্যতম শীর্ষ পুরুষ, মেলোডি কিংখ্যাত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত কণ্ঠশিল্পী ও সফল প্রযোজক চন্দন সিনহা । আজ এই গুণী সুরসাধকের শুভ জন্মদিন। সস্তা সস্তা ট্রেন্ড আর সস্তা জনপ্রিয়তার এই যুগে যিনি বুক চিতিয়ে খাঁটি বাংলা মেলোডি গানকে টিকিয়ে রেখেছেন, তিনি চন্দন সিনহা। তাঁর জাদুকরী কণ্ঠ, নিখুঁত পিচ এবং আবেগে ভরপুর পরিবেশনা দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগীতপ্রেমীদের বুঁদ করে রেখেছে। জন্মদিনের এই আনন্দঘন মুহূর্তে এই মহান শিল্পীর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং অফুরন্ত শুভেচ্ছা।

​স্বপ্নের পেছনে ছোটা: এক লড়াকু শৈশব ও কৈশোর

​চন্দন সিনহার আজকের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস। জন্মলগ্ন থেকেই তাঁর ধমনীতে মিশে ছিল সুরের ধারা। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গানের কঠোর রেয়াজে। একসময় তীব্র সংগীতের নেশায় এবং নিজেকে আরও বড় ক্যানভাসে মেলে ধরার জন্য তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন বলিউডের রাজধানী মুম্বাইয়ে। সেখানে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও গানকে বুক থেকে হারিয়ে যেতে দেননি। পরবর্তীতে স্বদেশে ফিরে এসে নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরেন এবং বাংলাদেশের মাটিতেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন।

​রাজকীয় অভিষেক ও নাটকের কালজয়ী গান

​নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ও দুই হাজার দশকের শুরুতে বাংলাদেশের নাটক ও অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে চন্দন সিনহার আগমন ঘটে রাজকীয়ভাবে। প্রখ্যাত নাট্যকার ও কিংবদন্তি পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনের জহুরি চোখ চিনে নিয়েছিল এই হিরের টুকরোকে। তাঁর বিখ্যাত ও তুমুল জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘শীর্ষবিন্দু’-র টাইটেল ট্র্যাকে কণ্ঠ দেওয়ার মাধ্যমে চন্দন সিনহা প্রথম শ্রোতাদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এরপর একে একে ‘জোয়ার ভাটা’-সহ অসংখ্য কালজয়ী নাটকের থিম সং গেয়ে তিনি নিজেকে নাটকের গানের একচ্ছত্র সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

​’আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো’: বাংলা গানের এক অমর ইতিহাস

​চন্দন সিনহার ক্যারিয়ারের কথা বলতে গেলে যে গানটির কথা স্বর্ণাক্ষরে লিখতে হবে, তা হলো ২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রাজ্জাক-কবরী জুটি এবং শাকিব খান অভিনীত ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ চলচ্চিত্রের “আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো” গানটি।

  • কবির বকুলের অসামান্য গীতিকবিতা,
  • শওকত আলী ইমনের কালজয়ী সুর ও সংগীত পরিচালনা,
  • ​এবং সর্বোপরি চন্দন সিনহার বুক চিরে আসা বিরহের কণ্ঠশৈলী।

​এই ত্রয়ীর মেলবন্ধনে গানটি মুক্তির পরপরই কোটি মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেয়। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে এফএম রেডিও—সবখানে শুধু এই একটি গানই প্রতিধ্বনিত হতো। এই কালজয়ী গানটির জন্যই তিনি শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁর প্রথম ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ লাভ করেন, যা তাঁর সংগীত জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

​সাফল্যের মুকুটে অজস্র পালক ও বহুমাত্রিকতা

​চন্দন সিনহা শুধু মাইক্রোফোনের সামনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং বাংলা সিনেমার খরা কাটাতে প্রযোজক হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী ২’ প্রযোজনা করে চলচ্চিত্র পাড়ায় নিজের সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ দেন। তাঁর দীর্ঘ ও গৌরবময় ক্যারিয়ারের কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন একনজরে দেখে নেওয়া যাক:

অর্জিত সম্মাননা/পুরস্কার

বছর

যে কাজের জন্য প্রাপ্ত

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার

২০১৩

শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী (পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী)

ঐক্য-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস

শ্রোতাদের ভোটে দশকের সেরা গায়ক (সিঙ্গার অব দ্য ডিকেড)

ইউরো বিনোদন বিচিত্রা পুরস্কার

২০০৩

শ্রেষ্ঠ গায়ক (জোয়ার ভাটা নাটকের শিরোনাম সংগীত)

এছাড়া দেশ-বিদেশের মাটিতে বহু সম্মাননা স্মারক এবং কোটি শ্রোতার ভালোবাসা তো রয়েছেই। বাপ্পা মজুমদার, কুমার বিশ্বজিৎ থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের অনেক সুরকারের সাথেই তিনি উপহার দিয়েছেন একের পর এক শ্রোতাপ্রিয় গান।

​সংগীতের একনিষ্ঠ সেবক ও আগামীর অনুপ্রেরণা

​বর্তমান যুগে যখন গানের স্থায়িত্ব কয়েক সপ্তাহের বেশি হয় না, সেখানে চন্দন সিনহার গান বছরের পর বছর ধরে মানুষের প্লে-লিস্টে রাজত্ব করছে। তিনি সবসময় সংখ্যার চেয়ে মানের (Quality over Quantity) ওপর জোর দিয়েছেন। রুচিশীল ও শুদ্ধ বাংলা গানের প্রসারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য তাঁর জীবন এবং গায়কী এক মস্ত বড় পাঠশালা।

​আজকের এই বিশেষ দিনে এই গুণী শিল্পীর জন্য আমাদের একটাই প্রার্থনা—সুরের এই জাদুকর যেন সুস্থ দেহে, দীর্ঘায়ু নিয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকেন। তাঁর কণ্ঠের জাদুতে আরও বহু বছর ধরে সমৃদ্ধ হতে থাকুক বাংলা সংগীতের ভুবন।

শুভ জন্মদিন, বাংলা গানের মেলোডি কিং চন্দন সিনহা! আপনার সুরের আলো ছড়িয়ে পড়ুক দিগন্ত থেকে দিগন্তে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *