সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৩৬ অপরাহ্ন
বিশেষ প্রতিনিধি:
কণ্ঠের মাধুর্য, গায়কির নান্দনিকতা আর মঞ্চ মাতানো অনন্য ব্যক্তিত্ব—এই তিনের নিখুঁত সমন্বয়ে যিনি গত কয়েক দশক ধরে দেশের বিনোদন জগতকে মোহিত করে রেখেছেন, তিনি আঁখি আলমগীর। একাধারে কণ্ঠশিল্পী, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত শিশুশিল্পী এবং কনসার্ট মাতানো পারফর্মার হিসেবে তিনি বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে এক আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছেন। ২৫ জুলাই এই গুণী শিল্পীর শুভ জন্মদিন। বর্ষীয়ান ও তরুণ—উভয় প্রজন্মের কাছেই তাঁর গ্রহণযোগ্যতা সমান।
আঁখি আলমগীরের ধমনীতে বইছে শিল্প ও সংস্কৃতির রক্ত। তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত কিংবদন্তি অভিনেতা ও পরিচালক আলমগীর এবং খ্যাতনামা গীতিকার খোশনুর আলমগীর-এর জ্যেষ্ঠ কন্যা। শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়েই তাঁর বেড়ে ওঠা। খুব ছোটবেলা থেকেই গানের সুর আর রূপালী পর্দার আলো-ছায়ার সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তবে পারিবারিক প্রভাবকে ছাপিয়ে নিজের মেধা, দক্ষতা ও একাগ্রতা দিয়ে তিনি ঢালিউড ও দেশের সংগীত ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন।
অনেকেই তাঁকে কেবল প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী হিসেবেই চিনে থাকবেন, কিন্তু তাঁর মিডিয়া যাত্রার শুরুটা হয়েছিল রুপালী পর্দায় ইতিহাস গড়ার মাধ্যমে। ১৯৮৪ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের কালজয়ী সিনেমা ‘ভাত দে’-তে তিনি অভিনয় করেন। সেখানে শাবানার শৈশবকালের চরিত্রে তাঁর হৃদয়স্পর্শী ও জীবন্ত অভিনয় তৎকালীন কোটি দর্শকের চোখ ভিজিয়ে দিয়েছিল।
মাত্র আট বছর বয়সে এই চলচ্চিত্রে শিশু চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ঢালিউডের ইতিহাসে এত কম বয়সে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার নজির খুবই বিরল।
অভিনয়ে অসামান্য সাফল্য ও তুমুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আঁখি আলমগীর তাঁর চিরন্তন ভালোবাসা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সুরের ভুবনকেই। শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেওয়ার পর ১৯৯৭ সালে মাত্র আঠারো বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘প্রথম কলি’। প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলীর সুরে এই অ্যালবামের গানগুলো রাতারাতি তাঁকে সংগীতাঙ্গনে তারকাখ্যাতি এনে দেয়।
এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্যাসেট ও সিডির স্বর্ণযুগে তিনি একের পর এক ব্যবসাসফল অ্যালবাম উপহার দিয়েছেন। পপ, মেলোডি, ফোক কিংবা ক্লাসিক্যাল—সব ধারার গানেই নিজের বহুমুখী মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।
বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের প্লেব্যাকেও আঁখি আলমগীর এক অত্যন্ত সফল নাম। সহস্রাধিক চলচ্চিত্রে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
সংগীতশিল্পী হিসেবেও ২০১৮ সালে ‘একটি সিনেমার গল্প’ চলচ্চিত্রের ‘গল্প কথার ওই আঁচল দিয়ে’ গানটির জন্য প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার সুরে কণ্ঠ দিয়ে শ্রেষ্ঠ গায়িকা হিসেবে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
আঁখি আলমগীর মানেই লাইভ শোতে এক অদম্য উদ্দীপনা। দেশে তো বটেই, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের প্রতিটি কোণায় বাংলা গানপ্রেমী মানুষের কাছে তিনি দারুণ জনপ্রিয়। স্টেজ পারফর্মেন্সে তাঁর চঞ্চলতা, প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি সুরের মাধ্যমে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা তাঁকে দেশের সেরা ‘লাইভ পারফর্মার’দের সারিতে বসিয়েছে।
গানের পাশাপাশি তাঁর আকর্ষণীয় সাজসজ্জা, ফ্যাশন সচেতনতা ও মার্জিত ব্যক্তিত্ব সবসময়ই বিনোদন অঙ্গনে চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে তিনি নিজেকে যেভাবে ধরে রেখেছেন, তা তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়।
সব বাধা পেরিয়ে সুরের ভুবনে তিনি যে অবদানের স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন, তা আমাদের বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছে বারবার। শুভ জন্মদিনে এই সুরসম্রাজ্ঞীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও নিরন্তর শুভকামনা।