
বিশেষ প্রতিনিধি:
ফুটবল কি কেবলই একটি খেলা, নাকি ৯০ মিনিটের কোনো এক মঞ্চস্থ নাটক—যা এক নিমেষে কোটি মানুষের হৃদয় ভেঙে দিতে পারে? যদি তাই হয়, তবে সেই নাটকের সবচেয়ে ট্রাজিক চরিত্রের নাম আজ ‘ব্রাজিল’। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, নান্দনিক ফুটবলের ফেরিওয়ালা আর সাম্বার ছন্দে বিশ্বকে মাতানো সেলেসাওদের হেক্সা (ষষ্ঠ শিরোপা) জয়ের মিশন আরও একবার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
মাঠজুড়ে তখন প্রতিপক্ষের উল্লাসের গর্জন, আর সবুজ গালিচায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদছেন নেইমার-ভিনিসিউসরা। আরও একটি টুর্নামেন্ট, আরও একটি বুকভাঙ্গা হাহাকার নিয়ে মাঠ ছাড়ল বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলটি।
খেলার শুরু থেকেই ব্রাজিলকে তাদের চেনা চনমনে রূপে পাওয়া যায়নি। যে আক্রমণাত্মক ও পাসিং ফুটবলের জন্য তারা বিখ্যাত, আজ যেন সেখানে ভর করেছিল এক অদ্ভুত জড়তা।
দলের মহাতারকাদের কাঁধে ছিল কোটি ভক্তের পাহাড়সম প্রত্যাশা। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে তারা ছিলেন নিজেদের ছায়া হয়ে। ভিনিসিউস জুনিয়রের সেই পরিচিত গতি কিংবা রদ্রিগোর চতুর ড্রিবলিং—কোনো কিছুই প্রতিপক্ষের জমাট রক্ষণব্যুহ ভাঙতে পারেনি। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় ফেরার বেশ কয়েকটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছিল বটে, কিন্তু ফিনিশিংয়ের চরম ব্যর্থতায় বল আর জালের দেখা পায়নি। ডাগআউটে বসা কোচের একের পর এক কৌশল বদলও মাঠে কোনো জাদুকরী প্রভাব ফেলতে পারেনি।
"আমরা আমাদের সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলাম, কিন্তু ভাগ্য আজ আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকায়নি। এই পরাজয় বেদনার, এই ক্ষত সহজে শুকানোর নয়।"
— ম্যাচ শেষে ভেজা চোখে মাঠ ছাড়ার সময় ব্রাজিলের অধিনায়ক।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময়ের স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়েও যখন গোলমুখ খোলা যায়নি, ম্যাচ তখন গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটের লটারিতে। আর সেখানেই ভাগ্যদেবী মুখ ফিরিয়ে নিলেন সেলেসাওদের থেকে।
স্নায়ুচাপের এই চূড়ান্ত পরীক্ষায় শট নিতে গিয়ে গোলপোস্টে বা প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের বিশ্বস্ত গ্লাভসে বল তুলে দেন ব্রাজিলের অভিজ্ঞ তারকারা। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ শীতল মাথায় লক্ষ্যভেদ করে ব্রাজিলের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। টাইব্রেকারের এই নির্মম পরিণতি ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে আরও একটি কালো অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হলো।
ব্রাজিলের এই হারে শুধু মাঠের খেলোয়াড়েরাই কাঁদেননি, কেঁদেছে গ্যালারিতে থাকা হাজারো সমর্থক। হলুদ-সবুজ জার্সিতে ছেয়ে যাওয়া গ্যালারির রঙিন উৎসব মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নেয় এক নিস্তব্ধ শ্মশানে।
স্টেডিয়ামের গণ্ডি পেরিয়ে এই কান্নার ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশেও। দেশের আনাচে-কানাচে যে চায়ের দোকানগুলো কাল রাতেও "ব্রাজিল, ব্রাজিল" স্লোগানে মুখরিত ছিল, আজ সেখানে কেবলই নীরবতা আর ভক্তদের চোখভরা জল। ফুটবল যে এ দেশের মানুষের কতটা আবেগের জায়গা, ব্রাজিলের হারে ভক্তদের এই স্তব্ধতাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ খতিয়ান (২০০২-২০২৬)
------------------------------------
২০০২ 🏆 চ্যাম্পিয়ন
২০০৬ ❌ কোয়ার্টার ফাইনাল
২০১০ ❌ কোয়ার্টার ফাইনাল
২০১৪ ❌ সেমিফাইনাল (৪র্থ স্থান)
২০১৮ ❌ কোয়ার্টার ফাইনাল
২০২২ ❌ কোয়ার্টার ফাইনাল
২০২৬ ❌ নকআউট পর্ব থেকে বিদায়
২০০২ সালের পর কেটে গেছে দীর্ঘ পথ। পেলের দেশের মানুষগুলোর কপালে হেক্সার চিলতে সুখ আর জোটেনি। প্রতিবারই ফেভারিট হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করা এবং নকআউট পর্বের ধাঁধায় আটকে বিদায় নেওয়া—এই বৃত্ত থেকে কবে বের হবে ব্রাজিল? এই হার ব্রাজিলের বর্তমান ফুটবল কাঠামো, খেলোয়াড়দের মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা এবং কৌশলগত পরিকল্পনার দিকে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন ছুড়ে দিল।
ফুটবল চিরকালই প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখে। বিষাদের এই ঘন কালো মেঘ কেটে গিয়ে লাতিন আমেরিকার এই পরাশক্তি আবার কবে বিশ্বমঞ্চে তাদের হারিয়ে যাওয়া গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে, ফুটবলবিশ্ব এখন সেই অপেক্ষাতেই থাকবে।
© দৈনিক জয় প্রভাত। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।