প্রিন্ট এর তারিখঃ অগাস্ট ৩, ২০২৬, ৯:৩৩ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ১২, ২০২৬, ৪:৪৩ এ.এম
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা! জয়ের আনন্দে ভাসছেন সৌদি প্রবাসী ইবনে আহমেদ শুভ

বিশেষ ক্রীড়া প্রতিবেদক, দৈনিক জয় প্রভাত:
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষে স্কোরবোর্ডে ১-১ সমতা। মাঠের ফুটবলারদের চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ, আর গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো আলবিসেলেস্তে সমর্থকসহ বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি ভক্তের বুকে তখন পেন্ডুলামের মতো দুলছে উৎকণ্ঠা। টাইব্রেকারের ভাগ্যপরীক্ষার শঙ্কা যখন গ্রাস করছিল সবাইকে, ঠিক তখনই জ্বলে উঠল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আসল রূপ। অতিরিক্ত সময়ের রূপকথার ফুটবল জাদুতে সুইজারল্যান্ডের লৌহকঠিন প্রতিরোধ ভেঙে শেষ পর্যন্ত ৩-১ ব্যবধানের এক মহাকাব্যিক জয় ছিনিয়ে নিল আর্জেন্টিনা। এই শ্বাসরুদ্ধকর বিজয়ের মধ্য দিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পা রাখল লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।
আজ মিসৌরির কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে টুর্নার্মেন্টের অন্যতম হাইভোল্টেজ এই কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল লাতিন আমেরিকার শৈল্পিক ফুটবল বনাম ইউরোপীয় ঘরানার জমাট ডিফেন্সের সুইজারল্যান্ড। আক্রমণ আর পাল্টা-আক্রমণের এই স্নায়ুযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অভিজ্ঞতারই জয় হলো।
মাক আলিস্তেরের বুলেট শটে উড়ন্ত সূচনা
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসে। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে সুইস ডিফেন্সকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে রদ্রিগো ডি পল ও আলেক্সিস মাক আলিস্তেরে জুটি। ম্যাচের ঠিক ১০ম মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। সুইস ডিফেন্সের একটি ভুল পাস ধরে ডি-বক্সের বেশ কিছুটা বাইরে বল পান মিডফিল্ডার মাক আলিস্তেরে। মুহূর্তের নোটিশে নেওয়া তাঁর এক চোখ ধাঁধানো বুলেট গতির দূরপাল্লার শট সুইস গোলরক্ষককে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে জালের ঠিকানা খুঁজে নেয়। ১-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে গ্যালারিতে আনন্দের জোয়ার বয়ে আনে আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধে বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও ব্যবধান আর বাড়াতে পারেনি তারা, ফলে ১-০ গোলের লিড নিয়ে বিরতিতে যায় স্কালোনির দল।
সুইজারল্যান্ডের অনবদ্য প্রতিরোধ ও নাটকীয় সমতা
দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ অন্য এক সুইজারল্যান্ডকে দেখা যায়। রক্ষণভাগের খোলস ছেড়ে গোল শোধ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে ইউরোপের এই দলটি। ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের সামান্য মনোযোগহীনতার চড়া মূল্য দিতে হয় আলবিসেলেস্তেদের। মাঝমাঠ থেকে পাওয়া এক থ্রু পাস ধরে নিখুঁত একক দক্ষতায় আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে জড়ান সুইস ফরোয়ার্ড দান এনদোয়ে (১-১)। সমতায় ফিরে সুইসরা যেন আরও ঘন ঘন আক্রমণ চালাতে থাকে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট পর্যন্ত দুই দলই জয়সূচক গোলের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলেও গোলমুখ খুলতে ব্যর্থ হয়। ফলে রেফারি ম্যাচটিকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে নিয়ে যাওয়ার বাঁশি বাজান।
অতিরিক্ত সময়ে স্কালোনির মাস্টারস্ট্রোক: আলভারেস ও মার্তিনেজ শো
অতিরিক্ত সময়ে ক্লান্ত সুইস ডিফেন্সের ফায়দা তুলতে কোচ লিওনেল স্কালোনি আক্রমণভাগে তাজা রক্ত নামান। মাঠে প্রবেশ করেন হুলিয়ান আলভারেস ও লাউতারো মার্তিনেজ। কোচের এই চালই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
ম্যাচের ১১২তম মিনিটে ডি-বক্সের ভেতর এক জটলার সৃষ্টি হলে ডিফেন্ডারদের পায়ের ফাঁক গলে ঠান্ডা মাথায় আলবিসেলেস্তেদের জয়ের দিশা দেখান 'স্পাইডার' খ্যাত হুলিয়ান আলভারেস। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে সেমিফাইনালের সুবাস পেতে শুরু করে আর্জেন্টিনা।
এরপর ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে, যখন ১২০ মিনিটের খেলা শেষ হয়ে ইনজুরি সময়ের (১২০+১ মিনিট) খেলা চলছিল, তখন সমতায় ফিরতে অল-আউট আক্রমণে ওঠে সুইজারল্যান্ড। আর এই সুযোগেই এক দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাক থেকে বল পান লাউতারো মার্তিনেজ। সুইস গোলরক্ষককে ওয়ান-টু-ওয়ান পজিশনে পেয়ে নিখুঁত কোনাকুনি শটে সুইজারল্যান্ডের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন এই ইন্টার মিলান তারকা। ৩-১ গোলের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টিনার পুরো ডাগআউট ও গ্যালারি।
মরুভূমির বুকেও আর্জেন্টিনার জয়োল্লাস
আর্জেন্টিনার এই অবিস্মরণীয় জয় কেবল মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছুঁয়ে গেছে দূর প্রবাসে থাকা কোটি ভক্তের হৃদয়কেও। ম্যাচ শেষ হতেই দূর প্রবাসে আনন্দের বন্যা বয়ে গেছে। আর্জেন্টিনার কট্টর ভক্ত, সৌদি আরব প্রবাসী বাংলাদেশি তরুণ ইবনে আহমেদ শুভ তাঁর বাঁধভাঙা আনন্দ প্রকাশ করে 'দৈনিক জয় প্রভাত'-কে বলেন—
"এখানে তখন ভোররাত, কিন্তু আমাদের চোখে ঘুম ছিল না। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের শত ক্লান্তির মাঝেও আর্জেন্টিনার এই জয় আমাদের সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে। ৯০ মিনিটের পর যখন সমতা ছিল, তখন বুক কাঁপছিল। কিন্তু আলভারেস আর লাউতারোর গোল দেখার পর আমরা প্রবাসীরা সবাই মিলে আনন্দে মেতে উঠি। মনে হচ্ছে বিশ্বকাপটা এবারও আমাদের ঘরেই আসছে!"
সেমিফাইনালে সামনে এবার 'থ্রি লায়ন্স' বাধা
কোয়ার্টার ফাইনালের এই অগ্নিপরীক্ষা পার করার পর বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে এবার ফাইনালের টিকিট কাটার লড়াই। আগামী ১৫ জুলাই সেমিফাইনালে তাদের মুখোমুখি হতে হবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ইংল্যান্ডের। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, আজকের এই অবিশ্বাস্য এবং লড়াকু পারফরম্যান্স যদি আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালেও ধরে রাখতে পারে, তবে আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে লিওনেল মেসির উত্তরসূরিদের দেখা যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। 'দৈনিক জয় প্রভাত'-এর পক্ষ থেকে আর্জেন্টিনার জন্য রইল লাল-সবুজ শুভেচ্ছা।
joyprovat.com