খুব ভোরে উঠে রওনা দিতে হয় ইজ্জত আলীকে। বাড়ি থেকে কারখানা প্রায় কুড়ি কিলোমিটার। তিন চার কিলোমিটার হাঁটা পথ। বাকিটা অটো কিংবা ইজি বাইকে করে শহরে পৌঁছাতে হয়। সকালে কিছু খাবার জুটলে খেয়ে দুপুরের খাবারটি সাথে নেয়। শহরে সে একটি লেদ কারখানায় কাজ করে। বয়স বারো তেরো হবে হয়তো। এই বয়সে কাজ করে মা’কে দেখা কম কথা নয়। যে বয়সে স্কুলের বারান্দায় সহপাঠীদের সাথে হৈ হুল্লোর করার কথা; যে বয়সে তাকে ডাক্তার কিংবা প্রকৌশলী হওয়ার রচনা লেখার কথা, সে বয়সে তাকে পেটের দায়ে সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
বাবার আদর কাকে বলে ইজ্জত আলী কখনোই অনুভব করেনি। তার জন্মের পরই বাবা-মা ছাড়া ছাড়ি হয়। সেই থেকেই বাবা নিরুদ্দেশ। মা’ই তাকে বড় করেছে। বাবাকে হয়তো মনেই নেই। মানুষের বাড়িতে কাজ করে মা ছেলে কোন মতে খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করে। কিন্তু বছর দু’য়েক হলো কাজ করে ফেরার পথে দূর্ঘটনায় করিমা বেগমের একটি পা ভেঙ্গে যায়। আর চলা-ফেরা করতে পারেনা না। অগত্যা ইজ্জত আলীকে কারখানায় কাজে লাগিয়ে দেন।
আজ সময়ের আগেই এসেছে ইজ্জত আলী। অনেক কাজের অর্ডার আছে। কাজগুলো শেষ করতে হবে। মহাজন খুব তাগাদা দিয়েছেন। এমনি তো গরমের দিন, তার উপর কাজের চাপ। মেটাল কাটিং টুলের সাহায্যে সুনির্দিষ্ট আকৃতি ও মাপের কাজ করছে। গরমে শরীর থেকে দরদর করে নোনা ঘাম ঝরিয়ে পড়ছে। চা খাওয়ারও ফুরসত নেই। সে লেদ কারখানায় গত দুই বছরে ইতোমধ্যে অনেক কাজ রপ্ত করেছে। টার্নিং, ফেসিং, ড্রিলিং, থ্রেডিং, নালিং, টেপার টার্নিং, বোরিং ইত্যাদি।
শুরুতেই ইজ্জত আলীর মাসিক মজুরী ছিল ছয় হাজার টাকা। গত মাস থেকে বেতন দুই হাজার বাড়িয়ে আট হাজার টাকা করা হয়েছে। লেদ মালিকরা সচরাচর ভালো হন না। কিন্তু ইবরাহিম মোল্লা অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ, ধার্মিক। ইজ্জত আলী কাজে যোগদানের পর থেকেই তাঁকে অনেক ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। কিছু কিছু মানবাধিকার সংস্থা শ্রম আইনের কথা বলেছে। তারা বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, শ্রম আইনে শিশু শ্রম বেআইনি ও দন্ডনীয় অপরাধ। ইবরাহিম মোল্লা আইনকে শ্রদ্ধা করেন। কিন্তু করিমা বেগমের আকুতি ও ইজ্জত আলীর মলিন চেহারার দিকে তাকিয়ে তিনি আর না করতে পারেন নি। পেট তো আইন বোঝেনা। এটা ইজ্জত আলীর ক্ষেত্রে আইনসিদ্ধ ছিল। তাইতো ইজ্জত আলীর পক্ষ নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সেদিন।
এমন এক সময়ে ইজ্জত আলীকে কাজে লাগানো হয়েছিল যে সময়ে করিমা বেগমকে কেউ একটি পয়সা দিয়েও সাহায্য করেনি। এই ইবরাহিম মোল্লাই প্রথম সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন। তাৎক্ষণিক মূহূর্তে করিমা বেগমের চিকিৎসা সেবা, ইজ্জত আলীকে কাজে লাগানো এবং নগদ অর্থ দিয়েছিলেন তিনি। সমাজে এখনো কিছু নিন্দুক আছে যারা কোন সাহায্য দিবেননা বরং আইন ও হালাল-হারাম নিয়ে অনেক ফাঁকা বুলি দিবেন। আবেগ ও বাস্তবতা রাত আর দিনের মতো পার্থক্য।
আজ মাসের প্রথম সপ্তাহ। বেতন পেয়েছে ইজ্জত আলী। মহাজনের নিকট একদিন ছুটিও নিয়েছে মা’কে ডাক্তার দেখাবে বলে। তাড়াতাড়ি যেতে হবে আজকে তাকে। এদিকে কাজের চাপও বেশি। মন একদিকে পড়ে আছে অসুস্থ মায়ের কাছে। অন্যদিকে কাজ শেষ করতে হবে। কাজের প্রতি তার অত্যন্ত শ্রদ্ধাবোধ। সে বুঝতো, যে বয়সে কাজ করলে দুটো পয়সা কামাই হবে সে বয়সটুকু নষ্ট করতে নেই।
আজকাল উপজেলা শহরেও মোটামুটি ভালো ডাক্তার বসেন। তবে হাড়ের ডাক্তার অতো ভালো পাওয়া যায়না। প্রথমত: গ্রামের হাতুড়ি কবিরাজ দেখানোর কারণে পায়ের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছিল। তবে এখন অনেকটা ভালো। শুরুতেই হাড়ের ডাক্তার দেখানো হলে অত সমস্যা হতোনা। তারপরও ডাক্তার সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সেরে উঠতে সময় লাগবে হয়তো। জেলা শহরে নিয়ে গেলে আরো ভালো ডাক্তার মিলতো। কিন্তু পয়সা সংকুলান হবেনা। বড় শহরে ডাক্তারের যতো ভিজিট, তার উপর বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা তো আছেই। তিন মাসের অগ্রীম বেতনেও কুলাবেনা।
মা ছাড়া ইজ্জত আলীর কেউ নেই। উপরে আল্লাহ, নিচে মা। এই টুকু বয়সেও মায়ের প্রতি এতো ভালোবাসা, এতো দরদ। কারখানার পাশে একটি মুদি দোকানে বিভিন্ন ওয়াজ বাজতো। কাজের মধ্যেও কানে ভেসে আসা ওয়াজ শুনতো। একদিন মায়ের ওয়াজ শুনে তার চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে পানি গড়িয়ে পড়েছিল। ওয়াজে শুনেছে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশ্ত। শুধু কি তাই, সন্তানের চামড়া দিয়ে মায়ের জন্য জুতা বানিয়ে দিলেও নাকি এক ফোঁটা দুধের দাম পরিশোধ হবেনা। এই ওয়াজটি শোনার পর থেকে মায়ের উপর তার ভালোবাসা আরো বেড়ে গিয়েছিল।
সময়ের পরিক্রমায় দিন, মাস, বছর পেরিয়ে যায়। ইতোমধ্যে ইজ্জত আলী শিশু শ্রমিক এর অপবাদ কাটিয়ে উঠেছে। সে এখন হেডমিস্ত্রি হয়ে গেছে। বেতনও বেড়েছে। মায়ের আর কোন কষ্ট হবেনা। করিমা বেগম ভাঙ্গা পা নিয়েই আবার কাজ করতে চায়। কিন্তু ছেলের একদম না। কোনমতেই মা’কে আর পরের বাড়িতে কষ্ট করতে দিবেনা। তিনি অনেক কষ্ট করেছেন, আর না। এখন সে যে মজুরী পায় তাতে মা ছেলের থাকা খাওয়ায় আর কোন সমস্যা হবেনা। কিন্তু মায়ের মন তো মানতে চায়না। ছেলে বড় হচ্ছে, বিয়ে দিতে হবে, ঘরে বউ আসবে, কত খরচ।
ইব্রাহিম মোল্লা মাঝে মাঝে কারখানা পরিদর্শন করেন। ইজ্জত আলীর কাজ দেখে তিনি খুবই খুশি। ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোও খুব নিখুঁতভাবে করতে পারে সে। সে-ই ছোট ইজ্জত আলী আজ অনেক বড় হয়েছে। এটা ভাবতেই ইব্রাহিম মোল্লার চোখ দিয়ে যেন আনন্দাশ্রু ঝরে। ভালো কাজে যে কী আনন্দ। মনে মনে ইজ্জত আলীর বিয়ে নিয়েও ভাবছেন তিনি। বিয়ে দিলে কাজেও আরো মনোযোগী হবে, তার মায়ের জন্যেও একটি সঙ্গী হবে।
ভাবতে ভাবতেই সত্যিই একদিন ইজ্জত আলীকে বিয়ে দিয়ে দিলেন ইবরাহিম মোল্লা। মেয়েটি দেখতে শুনতে খুব ভালো। গরীব ঘরের মেয়ে। তার কারখানার সামনে দিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা করতো। নবম শ্রেণিতে পড়ে। ইবরাহিম মোল্লার নজরে একদিন পড়েছিল। তাকে ডেকে বাড়ি-ঘর ও মা-বাপের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। তারপর তিনি নিজেই তার মা-বাবার নিকট প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন। পুত্রবধু পেয়ে করিমা বেগম যার পর নাই খুশি হয়েছেন।
সেদিন সাইফুল নামের একজন মিস্ত্রি কাজে আসেনি। লেদ কারখানার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রটি সে চালাইতো। অনেক কাজের অর্ডার আছে। হেড মিস্ত্রি হিসেবে দায়িত্বটি ইজ্জত আলীর উপরই বর্তায়। তাইতো মেটাল টার্নিং লেদ মেশিনে কাজ করছে সে। একটু তাড়াহুড়াও আছে। বউকে দোকানে নিয়ে যাবে কেনা-কাটা করার জন্যে। আগামিকাল থেকে কয়েকদিনের ছুটিতে যাবে সে। বউয়ের নানা বাড়ির সকল আত্নীয়-স্বজনরা দাওয়াত করেছে।
ইতোমধ্যে অনেক কাজ করা হয়েছে। কাজ প্রায় শেষের দিকে। হঠাৎ কী এক আনমনে হয়ে পড়ে ইজ্জত আলী। মেটাল টার্নিং চাকায় সার্টের একটি হাতা পেঁচিয়ে যায়। সাথে তার ডান হাতটিও চাকার ভেতর ঢুকে দুমড়ে মুচড়ে যায়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! যেই লেদ মেশিনের চাকায় ইজ্জত আলীর একদিন ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছিল, সেই মেশিনই আজ তার দূর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
খবর পেয়ে ইবরাহিম মোল্লা তাৎক্ষণিক এসে ইজ্জত আলীকে এ্যাম্বুল্সে করে সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। অর্থোপেডিক ডাক্তার দেখে জানান যে, তার ডান হাতটি কেটে ফেলতে হবে নইলে পচন ধরলে হয়তো শরীরের অন্য অংশেও জীবানু ছড়িয়ে যেতে পারে। অনেক টাকার প্রয়োজন। ইজ্জত আলীকে কিছুই জানানো হয়নি। ইবরাহিম মোল্লা ডাক্তারকে অপারেশনের ব্যবস্থা করতে বলে ব্যাংকে চলে যান।